সোমবার থেকে উচ্ছেদ অভিযান, আতংকে লালদিয়ার চরের ২৩শ’ পরিবার


আপডেটের সময়ঃ ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২১


অবশেষে সোমবার থেকে চট্টগ্রামের লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ লক্ষ্যে ৬ জন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ছয়টি জোনে ভাগ করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোর প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ, আনসার মোতায়েনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত শ্রমিক, বুলডোজার, স্ক্যাভেটার, ট্রাকেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সোমবার (১ মার্চ) থেকে এ উচ্ছেদ অভিযানে ইতিমধ্যে উচ্ছেদের আওতাভুক্ত প্রায় ৫২ একর এলাকার গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাইকিংও করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই বাসাবাড়ির আসবাব, তৈজসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।

 গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করে বিষয়টি স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটিকে জানিয়ে দিয়েছেন। এ সময় বন্দর চেয়ারম্যানও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানান, উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে লালদিয়ার চরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ বাধ্য।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার উচ্ছেদ অভিযান সামনে রেখে রোববারও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সঙ্গে চূড়ান্ত প্রস্তুতি সভা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, নগরীর পতেঙ্গায় বিমানবাহিনীর ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য ১৯৭২ সালে কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে সরিয়ে লালদিয়ার চরে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। ১৯৭৫ সালের পর বিভিন্ন আইনি জটিলতার ফাঁকে লালদিয়ার চরের ওই ভূমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বিএস জরিপে লিপিবদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে লালদিয়ার চরের বাসিন্দাদের বেআইনিভাবে বসবাসকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ২০০৫ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ার চরে বসবাসরত প্রায় ৫০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করে সেই ভূমি ইজারা দেয় ইনকনট্রেড লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। সেখানে ওই প্রতিষ্ঠান একটি অফডক নির্মাণ করেছে। লালদিয়ার চরে এখন প্রায় ২৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষ বসবাস করছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও ২৫ একর জায়গা উন্নয়ন করে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে লালদিয়ার চরের কয়েক হাজার মানুষ মানববন্ধন করে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের দাবি জানান।

এদিকে নগরীর পতেঙ্গায় লালদিয়ার চরের বাসিন্দাদের পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ না করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের দুই সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন ও ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল। চট্টগ্রামের আপামর মানুষের দাবি না মেনে উচ্ছেদে গিয়ে কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ালে তার দায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলেও তারা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। শনিবার  সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো পৃথক বিবৃতিতে দুই নেতা এসব কথা বলেছেন।

এ প্রেক্ষাপটে দেওয়া বিবৃতিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, এক শ্রেণির লোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। তাদের সঙ্গে মিলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ার চরের হাজার, হাজার মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করতে চাচ্ছে। তাদের মুখোশ চট্টগ্রামবাসীর সামনে খুলে গেছে। ষড়যন্ত্রকারী লোভী ব্যবসায়ীদের তালিকা হচ্ছে। সুষ্পষ্টভাবে বলতে চাই, পুনর্বাসন ছাড়া লালদিয়ার চরবাসীকে উচ্ছেদ করা যাবে না। উচ্ছেদ করতে গিয়ে যদি রক্তক্ষয় কিংবা কোনো মানুষের জীবনহানি হয় তার পূর্ণ দায়দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। বন্দরের অভ্যন্তরে বসে কারা এসব কাজে উসকানি দিচ্ছেন, তার তালিকাও আছে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হওয়া কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এ কাজে জড়িত। চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা বিএনপি-জামায়াত চক্র প্রধানমন্ত্রীর সব অর্জনকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে চায়। তারা চায় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বিএনপি জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে।

এদিকে পৃথক বিবৃতিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল বলেন, স্বাধীনতার পর বিমানবাহিনীর ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য লালদিয়ার চরে পতেঙ্গার স্থানীয় কিছু বাসিন্দাকে স্থানান্তর করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ ৪৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা সেখানে বসবাস করছেন। হঠাৎ করে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়া হাতেগোনা মাত্র কয়েকদিন সময় দিয়ে প্রায় ১৪ হাজার বাসিন্দাকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অমানবিক। আমরা এ ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

অন্যদিকে লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আলমগীর হাসানের কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নেতৃত্বে আমরা বৈঠক করেছি। নিষ্ফল বৈঠক হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ আদালতের রায় ও নির্দেশনা থাকায় উচ্ছেদ অভিযান ১ মার্চ পরিচালনা করবে বলে জানিয়েছে। আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লালদিয়ার চরের পরিবারগুলোকে খাসজমিতে পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছি।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।