জঙ্গল সলিমপুর: ৩৭ পাহাড়ের ভাঁজে জিম্মি বসবাসকারী ৫০ হাজার মানুষ


আপডেটের সময়ঃ অক্টোবর ১১, ২০২০


সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রামের জঙ্গল ছলিমপুর পাহাড়ী এলাকাটি। শান্তিপ্রিয় মানুষের আবাসস্থল জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ীদের কারণে পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রতিনিয়ত আতংকে দিনযাপন করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন এই এলাকাকে সন্ত্রাসীরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে আসলেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সন্ত্রাসীরা এ পাহাড়ি অঞ্চলকে তাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করছে। অধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হত্যা,ধর্ষণ, চাঁদাবাজি,নারীনির্যাতন সহ বহুমাত্রিক অপরাধ কর্মকান্ডই চলে আসছে এ পাহাড়ি এলাকায়। দুর্গম এ স্থানে চাইলেই যখন তখন প্রবেশ করত পারেনা পুলিশ। যার ফলে এলাকাটিকে অপরাধীরা তাদের নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলছে ।

জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় ঘেরা দুর্গম এ এলাকায় থাকা ৩৭টি পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে দুটি আবাসিক এলাকা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ ৩৪টি পাহাড় কেটে ৫৮৬ দশমিক ৬০ একর জায়গা দখল করে গড়ে তুলেছে ১৩ হাজার ৯০০ প্লট। আর আলীনগর সমবায় সমিতি লিমিটেড তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ দশমিক ৩২ একর জায়গা দখল করে গড়ে তুলেছে প্রায় আড়াই হাজার প্লট। একাধিক গ্রুপের মদদে ৪০ থেকে ৬০ জনের একটি দল সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা এসব প্লটের প্রতিটি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকায় বেচাকেনা করে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। এখানে পাহাড় কাটা হয় ‘টোকেন’ দিয়ে। আর টোকেন কেনা ৫০ হাজার মানুষকে জিম্মি করতে সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুরা দুর্গম এ এলাকায় গড়ে তুলেছে স্বতন্ত্র এক সা¤্রাজ্য। পাহাড়গুলো কেটে সাবাড় করার এমন ভয়াবহ চিত্র উঠে অনেক আগে এসেছিল খোদ সীতাকু- ভূমি অফিসের জরিপেই। অনেক আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককেও।

এলাকার সুশিল সমাজের প্রতিনিধি ভুক্তভোগী মো. শহীদ জানান, শান্তিপ্রিয় মানুষের আবাসস্থল জঙ্গল সলিমপুর। একাধিক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এলাকাটি। বিশেষ করে পুলিশ মার্ডার মামলায় সদ্য জেল খেটে আসা অস্ত্র ও ডাকাতি এবং জোড়া ডেবার পার ডিম ব্যবসায়ী হত্যা মামলার আসামী মো. কাজলের চাঁদাবাজিতে খেজুর বাগান এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কাজল একাধিকবার গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে এসে চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধ কর্মকান্ড। আমি গত শুক্রবার একটি জায়গা বিক্রির জন্য মাপতে গেলে কোমরে থাকা অস্ত্র উচিয়ে দুই লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছে সন্ত্রাসী কাজল। তিনি কাজলসহ এখানকার সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে এমনকী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

জানা গেছে, এখানের ছিন্নমূল নেতা  গাজী সাদেকুর রহমান, কাজী মশিউর রহমান, গোলাম গফুরসহ একাধিক বাহিনীর  কথায় চলে ৩৪টি পাহাড়ের ৪০ হাজার বাসিন্দা। আবার আলীনগর সমবায় সমিতির তিনটি পাহাড়ে থাকা ১০ হাজার মানুষ আইন মনে করেএকাধিক নেতার নির্দেশকে। এসব বাহিনীর নেতাদের বিরুদ্ধে ডজনের উপরে মামলা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকজন সন্ত্রাসীর কথা ছাড়া পাতাও নড়ে না ৩৭ পাহাড়ে। এসব সন্ত্রাসীরা একাধিক বার পুলিশ ও র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হলেও ফের হজামিনে বের হয়ে এসে আবার চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধ বাণিজ্য। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীরা আলাদা এক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। জায়াগাটি অনেক দূর্গম বলে তারা জানান।

জানা গেছে, কাগজে-কলমে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুন্ডে। কিন্তু দুর্গম এ স্থানে চাইলেই প্রবেশ করতে পারে না থানা পুলিশ। এলাকাকে ‘নিরাপদ সাম্রাজ্য’ বানাতে প্রবেশের পথ করা হয়েছে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরের বায়েজিদ থানা এলাকা দিয়ে। এখান দিয়েও প্রবেশ করতে গেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সাংবাদিকদের নিতে হয় আগাম অনুমতি। কারণ, সাত-আট কিলোমিটার মেঠোপথের মোড়ে মোড়ে আছে আলাদা গেট। আছে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী। এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে গেলে কাটতে হবে পাহাড়। এ জন্য নেতারা দেয় বিশেষ এক ধরনের টোকেন। পাহাড় কাটা পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০০ টাকা দিয়ে নবায়ন করতে হয় এ টোকেন। এরপর পাহাড় থাকার উপযোগী হলে জাল দলিল দিয়ে হয় বায়না। ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এখানে বেচাকেনা হয় পাহাড়ের প্লট। পরিচালনার সুবিধার্থে ভূমিদস্যুরা পাহাড়ে বসবাসকারীদের একাধিক সমাজে বিভক্ত করেছে। এর মধ্যে ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমিতির আছে ১১টি সমাজ। আর আলীনগর সমবায় সমিতির আছে একটি সমাজ। সমাজ নেতাদের মাধ্যমেই এখানে পাহাড় কেনাবেচা হয়। আবার পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা প্লটে লাগে বিদ্যুৎ সংযোগ। নিয়মবহির্ভূতভাবে এ টোকেন-প্রথা চালু করে জিম্মি করে রাখা হয়েছে ৩৭ পাহাড়ের ভাঁজে বসবাসকারী ৫০ হাজার মানুষকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।