চসিক নির্বাচনে নগরজুড়ে উৎসবের আমেজ: উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভোটাররা


আপডেটের সময়ঃ জানুয়ারি ২৫, ২০২১


চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এর নির্বাচন ২৭ জানুয়ারী বুধবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকারি দলের প্রার্থীর পাশাপাশি অন্যান্য দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সোমবার শেষ দিনের প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মত। এই ভোট উৎসবের জন্য প্রস্তুত প্রার্থী ও ভোটাররা। কিন্তু ভোটারদের ভেতরে ভোট নিয়ে আছে শঙ্কা, আছে ভয়। নির্বাচনকে ঘিরে ভোটারদের সঙ্গে সঙ্গে শঙ্কা আছে প্রার্থীদের ভেতরও। একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।তবে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে চসিক নির্বাচনের রিটানিং অফিসার। তিনি বলেছেন,  কোনো ধরনের সহিংসতা ছাড়া ভোট গ্রহণ শেষ করা ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলেও শান্তিপূর্ণভাবে সব কার্যক্রমে সফল হবে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি। বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেলে ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে সিটির ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

সোমবার সকালে ২১ নং জামালখান ওয়ার্ডের নতুন ভোটার ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র আরিফ হোসেন বলেন, এই প্রথম ভোট দিবো। তাই ভোটের দিনের অপেক্ষায় আছি। অনেক আনন্দ লাগছে ভোট দিবো বলে। কাকে ভোট দিবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পছন্দের প্রার্থী রয়েছে। তাকেই ভোট দিবো।

টানটান উত্তেজনায় সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা সেমাবার ছিল শেষ দিন। এর আগে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা শুরু হয় গত ৮ জানুয়ারি থেকে। আগামী ২৭ জানুয়ারি বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে। শেষ দিনে প্রধান দুই মেয়র প্রার্থী আওয়ামী লীগের রেজাউল করিম চৌধুরী এবং বিএনপির ডা. শাহাদাত হোসেনসহ ৭ মেয়র প্রার্থী এবং ২২৫ জন কাউন্সিলর প্রার্থী শেষ মুহূর্তে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। গতানুগতিক প্রচার-প্রচারণার বাইরে এবার প্রত্যেক প্রার্থীর প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে ভিন্নমাত্রা। ডিজিটাল প্রচারণায় পেয়েছে শৈল্পিক রূপ। ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে সশরীরে না গেলেও প্রার্থীরা ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। শুধু মিছিল-স্লোগানে থেমে থাকেননি প্রার্থী এবং কর্মী-সমর্থকরা। মেয়র থেকে শুরু করে প্রতিটি কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটারদের মন জয়ে শৈল্পিক প্রচারণা চালান। জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠে ছিল মন মাতানো গান। কোন প্রার্থী কোন মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আর তাদের প্রতিশ্রুতির কথা পৌঁছে গেছে ভোটারদের কাছে। প্রচারণা শেষ হলেও এবার শুধু অপেক্ষার পালা । কে হচ্ছেন বিজয়ী। ভোটারদের মাঝেও কৌতুহল দেখা গেছে।

এদিকে সোমবার ৭৩৫টি কেন্দ্রে অনুশীলনমূলক (মক) ভোট সম্পন্ন হয়। সকাল ১০টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভোটারদের ইভিএম-এ ভোট দেয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেন প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা। এব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান জানান, এবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সকল কেন্দ্রে (৭৩৫টি) ইভিএম-এ ভোট গ্রহণ হবে। এজন্য আমাদের সকল প্রস্তুতি রয়েছে। ভোটাররা ইভিএম-এ কিভাবে ভোট দেবেন-সেই পদ্ধতি ভোটারদের আগে জানিয়ে দেয়ার জন্য আমরা অনুশীলনমূলক (মক) ভোটের আয়োজন করেছি। ভোটাররা সরেজমিন ভোট কেন্দ্রে গিয়ে কিভাবে ভোট দেবেন এবং তিনি যেই জায়গায় ভোট দিচ্ছেন তা ঠিক মতো দিচ্ছেন কিনা সব জেনেছেন -এই মক ভোটিংয়ের সময়। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে যা যা করা দরকার, ইসি তাই করবে। তবে শঙ্কা যে নেই, তা নয়। কিন্তু শঙ্কার ভাবনা থেকে আমরা অতিরিক্ত সতর্ক থাকব। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন যেই করুক না কেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমাদের নির্দেশনা আছে, যেন অহেতুক কাউকে হয়রানি না করা হয়। নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মাঠে নামছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে তাদেরকে সকল ধরনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

২৯ নং পশ্চিম মাদারবাড়ি ওয়ার্ডের ভোটার নিলুফা ইয়াসমিন জানান, বিগত সাতদিন থেকে আনন্দ লাগছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোট দিবো বলে। তবে তিনি সুষ্ঠ ভোট নিয়ে শংকার কথা জানালেন। একই কথা বললেন ৩৬ নং গোসাইলডাঙ্গা ওয়ার্ডের বৃদ্ধ ভোটার আবুল কালাম। তিনি বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখি আমার নিজের ভোট অন্যজনে দিয়ে ফেলেছে , ভোট দিতে পারিনি। এবারও তিনি ভোট কেন্দ্রে যাবেন। যদি তার ভোট কেউ দিয়ে ফেলে এ জীবনে আর ভোট কেন্দ্রে যাবেননা বলেও জানান।

জানা গেছে, চসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে ৭৩৫টি কেন্দ্রে এবং ৪ হাজার ৮৮৬টি বুথে। এর মধ্যে অস্থায়ী ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ২টি, অস্থায়ী বুথের সংখ্যা ৭৬৪টি। ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৭৩৫ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ৪ হাজার ৮৮৬ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৯ হাজার ৭৭২ জন পোলিং কর্মকর্তা।

এদিকে আওয়ামী লীগ বারবার ইসিতে অভিযোগ করেছে, বিএনপি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের এনেছে নাশকতা সৃষ্টির জন্য। এদিক বিএনপিও একই অভিযোগ করেছে ইসিতে। প্রার্থী ও ভোটারদের ভেতর নির্বাচনী সহিংসতাসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক অপরাধের যেসব শঙ্কা রয়েছে, তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে নির্বাচন কমিশন। সে জন্য নির্বাচন নির্বিঘ্নে করতে ইসির নির্দেশে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শনিবার থেকেই বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চৌকি বসিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এছাড়া ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো ভোটারকে কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার পথে কেউ বাধা দিলে বা ভয়ভীতি, অস্ত্র, শক্তি প্রদর্শন করলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

হিংসতাপ্রবণ এলাকার কেন্দ্রগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। তবে পুলিশের দৃষ্টিতে ‘ঝুকিপূর্ণনয় কিছু কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নগরীর চার প্রবেশ পথে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। পুলিশ কমিশনার নিজেই রাতে বের হয়ে থানা পুলিশের কার্যক্রম নজরদারি করছেন।

জানা গেছে, আগামী ২৭ জানুয়ারি চসিক নির্বাচনে ৭ জন মেয়র প্রার্থীসহ মোট ২৩৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আসন্ন নির্বাচনে প্রায় ৫৭ শতাংশ কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এবারের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নগরীর বাইরে হাটহাজারী থানা এলাকার একটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে সেই কেন্দ্রকেও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। আর নগরীর ৭২৩ টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১০টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ৩১৩টি ভোট কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছে নগর পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রেখে নির্বাচন সম্পন্ন করতে নয় হাজার পুলিশ সদস্য  কাজ করবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। এর বাইরে থাকবে আনসার বাহিনীর সদস্য। নির্বাচনে দায়িত্বপালনে পুলিশ সদস্যরা আসবেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থাকে। তাদের অন্তত চারদিন অবস্থান করতে হবে। বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য রাখতে নগর পুলিশের চার জোনে সুবিধাজনক স্থানে চাহিদা অনুযায়ী কমিউনিটি সেন্টার নির্ধারণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (সিএমপি) সালেহ মোহাম্মদ তানভীর জানান, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কোন ভোট কেন্দ্রকে আমরা ‘ঝুকিপূর্ণ’ হিসেবে দেখছি না। তবে কিছু ভোট কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নগরীর ৭২৩টি কেন্দ্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৪১০টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ৩১৩ টি কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ হিসেবে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আরো এক সপ্তাহ বাকি। এরমধ্যে পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্রের সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে। এদিকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে বাড়তি কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে প্রসঙ্গে নগর পুলিশের বিশেষ শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) আবদুল ওয়ারিশ জানান, গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছুই করা হবে। কোন ধরনের সহিংসতা কিংবা অঘটন ছাড়া সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করতে আমাদের চেষ্টা থাকবে। জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক জানান, পাহাড়তলী ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রের ভোটের দায়িত্ব পালন করবে জেলা পুলিশ। ওই কেন্দ্রটিকে আমার ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছি। সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন থাকবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত: চসিক নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন ২৫ প্লাটুন (৭৫০ জন) বিজিবি, ৪৯২ জন র‌্যাব, ৪ হাজার ৩০৮ জন পুলিশ এবং ৮ হাজার ৮২০ জন আনসার সদস্য। সোমবার থেকে ভোটের আগে-পরে চার দিন দায়িত্ব পালন করবেন তারা। পাশাপাশি মাঠে থাকছে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। এবারের নির্বাচনে সব বাহিনী মিলে মোট ১৪ হাজার ৩৭০ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। মোবাইল টিম থাকবে ৪১০টি, স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে ১৪০টি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন ৭৬ জন। প্রতি ওয়ার্ডে ১ জন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া বিজিবির প্রতি প্লাটুনে ১ জন করে এবং র‌্যাবের সাথে ৩ জন দায়িত্ব পালন করবেন।

নির্বাচনে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপি দায়িত্ব পালন করবে। সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ১৬ জন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন করে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, এপিবিএন, ব্যাটালিয়ন আনসার, বিজিবি ও র‌্যাব। ইভিএমের কারিগরি সহায়তায় প্রতি ভোট কেন্দ্রে সশস্ত্র বাহিনীর দুজন করে সদস্য নিয়োগ থাকবেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।