গ্যাসের রাইজার পরীক্ষা: ঝুঁকিতে ৫ লাখ ৯৮ হাজার আবাসিক বার্নার


আপডেটের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ৭, ২০২০


গত বছর ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটার ব্রিকফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনে ঘটেছিল গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ভয়াবহ ঘটনা। সেই বিস্ফোরণে সাতজনের প্রাণহানির পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস রাইজার থেকেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।’ সেই সাথে বলা হয়েছে আবদ্ধ অবস্থায় গ্যাসের রাইজার রাখার কারণেই বড়ুয়া ভবনে ঘটেছে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা। দায়ী করা হয়েছিল বাড়ির মালিককে। ঠিক এই ঘটনার পরপরই গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যাসের রাইজার পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছিল কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)।

ওই সময়ে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, গ্যাস রাইজার পরীক্ষায় শতাধিক প্রকৌশলী ও ৪০ জন মেরামত কর্মীর সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক টিম গঠন করা হয়েছে। কোনো রাইজারের লিকেজ বা কোনো ধরনের সমস্যা পেলে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ তৎক্ষণাৎ মেরামত করে দেওয়া হবে। কিন্তু করোনার কারণে সেই কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি কেজিডিসিএল। যার ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫টি আবাসিক বার্নার।

এদিকে করোনাকালে নারায়ণগঞ্জের বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর কপালে নতুন দুশ্চিন্তার  ভাঁজ ফেলেছে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্যাসে লিকেজ লাইন। যদিও গ্যাস লাইন লিকেজের কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে কি’না তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কেজিডিসিএল এর কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে তাদের ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫টি আবাসিক বার্নার রয়েছে। এজন্য ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার সরবরাহ লাইন ব্যবহার করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ, সংযোগ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রাইজার রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার। এসব গ্যাস লাইন শতভাগ পরীক্ষা নিরীক্ষার কাজটি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন।

তবে এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি কেজিডিসিএল’র মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস) প্রকৌশলী মো. সারওয়ার হোসেন। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে কথা বলার বিষয়ে নতুন করে পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এখন কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া সাংবাদিকদের সাথে কথা বলা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে কেজিডিসিএল’র একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ওই দুর্ঘটনার পর চট্টগ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ রাইজার চিহ্নিত করতে নেমেছিল ৬টি টিম। ওই সময়ে পাথরঘাটা এলাকায় পরীক্ষা করা হয় ৮২৬টি রাইজার। এর মধ্যে ১৩টি রাইজার পাওয়া যায় বড়ুয়া ভবনের মতোই আবদ্ধ অবস্থায় (ভবনের অভ্যন্তরে)। ২৬টি রাইজার পাওয়া যায় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। তাছাড়া লিকেজ অবস্থায় রাইজার পাওয়া যায় প্রায় ২০টি। লিকেজগুলো তাৎক্ষণিক মেরামতের পর ভবনে এসব ঝুঁকিপূর্ণ লাইন-রাইজার অপসারণে মালিকদের নোটিশ দিয়েছিল কেজিডিসিএল।

ওই একই সূত্র আরও জানায়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে চলতি বছরের মার্চের প্রথম দিন থেকে নতুন করে শুরু হয় দ্ধিতীয় দফায় গ্যাস রাইজার-লাইন পরীক্ষার কাজ। ওই সময়ে বিশ্বরোড, কৈবল্যধাম, একে খানসহ এর আশপাশের এলাকায় গ্যাস লাইন পরীক্ষা করে কেজিডিসিএল’র ৬টি টিম। এতে ১ হাজার ৩৫টি গ্রাহকের (কিচেন) গ্যাস লাইনের লিকেজ পরীক্ষা করা হয়। এতে লিকেজ পাওয়া যায় অন্তত ৩০টি লাইন। তাছাড়া অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার কারণে কেটে দেওয়া হয় ১টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ৪টি কর্মাশিয়াল লাইন। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে হানা দেয় করোনাভাইরাস। প্রথম থেকেই আশঙ্কা ছিল চট্টগ্রাম হতে পারে করোনা সংক্রমণের তীর্থস্থান। এমন শঙ্কার মুখে ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ হয়ে যায়  চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস লাইন-রাইজার চিহ্নিত করণের চলমান কাজ।

জানা গেছে, গত ১৭ নভেম্বর নগরের পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডের বড়ুয়া ভবনের নিচতলায় গ্যাস বিস্ফোরণে ৭ জন নিহত ও ১০ জন আহত হন। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস রাইজার পরবর্তী জিআই অংশ থেকে রান্নার জন্য প্রাকৃতিক মিথেন গ্যাস বন্ধ শূন্যস্থানে বিপুল পরিমাণে জমা হয়ে ২ নম্বর কক্ষে প্রথমে প্রবেশ করেছে। সেখানে সকালে পূজার জন্য জ্বালানো ম্যাচের কাঠি থেকে এই বিপুল বিস্ফোরণ হয়েছে। যা মুহূর্তেই ঘরের রাস্তার পাশের দেয়াল ও পূর্ব পাশের দেয়াল উড়িয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। মোট ১৩ পৃষ্ঠার ওই তদন্ত প্রতিবেদনে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানিকে হটলাইন সেবা চালুসহ ৫টি সুপারিশও করা হয়েছিল।

কেজিডিসিএল’র এক সিনিয়ির কর্মকর্তা বলেন, গ্যাস আবদ্ধ অবস্থায় জমা হলে ইলেক্ট্রিক স্পার্ক অথবা আগুনের শিখার ছোঁয়া পেলেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তাই গ্যাসজনিত ভয়ঙ্কর এসব বিস্ফোরণ এড়াতে প্রথমেই প্রয়োজন উন্মুক্ত স্থানে রাইজার ও গ্যাস লাইন স্থাপন। এতে করে লিকেজ লাইন থেকে বের হওয়া গ্যাস সহজেই উপরের দিকে উঠে যেতে পারে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকেনা। এসব বিষয়ে সচেতন করতে অনেক নগরজুড়ে প্রচারণা চালিয়েছি আমরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।