কন্টেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু


আপডেটের সময়ঃ সেপ্টেম্বর ৩, ২০২০


চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গা এলাকায় ইনকন্ট্রেড কন্টেইনার ডিপোতে গাড়ির তেলের ট্যাংকে ওয়েল্ডিং করার সময় বিস্ফোরণে দ্বগ্ধ আরও এক শ্রমিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। গত বুধবার এ ভয়াবহ বিস্ফোরনে সর্বমোট  চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তিনজন ঘটনাস্থলে দ্বগ্ধ হয়ে মারা গেলেও মো. রবিউল নামে আরেকজন বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ) রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।  চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. এস খালেদ জানান, আহত রবিউলের ৯৫ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল।

ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, ওই ডিপোর ওয়ার্কশপে গত বুধবার ডিজেল ট্যাঙ্ক বিস্ফোরণে মুহুর্তেই ছড়িয়ে যায় আগুন। অথচ দুর্ঘটনাস্থলের প্রায় ২০ গজ দূরেই ছিলো ডিপোটির ডিজেল পাম্প! তাছাড়া ঘটনাস্থলেই থাকা ট্রাক-কন্টেইনারবাহী (এফএলটি) ক্রেনগুলোতে মজুদ ছিল ২০০ থেকে ২৫০ লিটার ডিজেলের ট্যাঙ্ক। সেখানে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটলে লেবাননের বৈরুতের মত বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো চট্টগ্রামে। আর ঝুঁকিতে পড়তো আশপাশের চট্টগ্রাম বন্দরসহ পাশ্ববর্তী অনেক কেপিআই স্থাপনা সমূহ।

অভিযোগ উঠেছে, এই আগুন নেভানোর কাজে  ডিপোটির অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো ঠিক মত কাজ করেনি। ডিপো শ্রমিকদের অভিযোগ,  দ্রুত গতির এই আগুন নেভাতে সেখানে মজুদ থাকা যেসব অগ্নিনির্বাপক ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তার বেশিরভাগই ছিল অকেজো। তাৎক্ষণিক কাজ করেনি ঘটনাস্থলেই থাকা অগ্নিনির্বাপক পানির কলটি। তাছাড়া একে একে ১০ টির বেশি অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হলেও সেগুলো ছিল মূলত খালি। ঘটনাস্থলেই আগুনে পুড়ে ৩ জনের বিভৎস মৃত্যুর পর অগ্নিদগ্ধ বাকি ৩ জনকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন সহকর্মীরা। ডিপো থেকে একটি গাড়ি (কার/মাইক্রো)  চাইলেও তাদের দেওয়া হয়েছিল ৩ চাকার একটি টমটম।

বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা জানান, চোখের সামনে মুহুর্তেই পুড়ে অঙ্গার হয় মুক্তার, আরমান ও নেওয়াজ। পাশাপাশি আগুনে পোড়া যন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করছিলেন-রবিউল, আমির ও আরও একজন। তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে একটি গাড়ি চাইলে তাও দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ডিপোতে নেই একটিও এম্বুলেন্সও। যদিও রবিউল রাতে মারা যান সেই দুর্ঘটনায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপোটিতে কর্মরত একজন বলেন, এত বড় ডিপোতে সব পানির কল নষ্ট। ১৪ টি অগ্নিনির্বাপন সিলিন্ডার আনা হলেও কাজ করেছে মাত্র দু’টি। শুনলাম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িও দেয়নি।

এসব বিষয় তাৎক্ষণিক পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়ে শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, আগুন নেভাতে পানি আনা হয়েছিল মেইন গেটের ওদিক থেকে। যা ছিল ঘটনাস্থল থেকে বেশ দূরে। অথচ কাজ করেনি ঘটনাস্থলের পাশেই থাকা অগ্নিনির্বাপক কলটি। এতে করে আগুন নেভানোর পানি টানতেই লেগে যায় ১৫/২০ মিনিট। অথচ তাৎক্ষণিক পানি কিংবা অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার পেলে বাঁচানো যেত অন্তত আরও তাজা ১টি প্রাণ। তাছাড়া ডিপোটির ভেতরে থাকা সব মেয়াদোত্তীর্ণ অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সরিয়ে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। রয়েছে এমন অভিযোগও।

ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের একটি সূত্র বলছে, ওই ডিজেলে ট্যাঙ্কটির মুখ বন্ধ রেখেই ঝালাই কাজ করা হচ্ছিল। ফলে ট্যাঙ্কে জমে থাকা গ্যাস থেকে এই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। পুলিশের বক্তব্যও একই। তবে ফায়ার সার্ভিসের ওই সূত্রটি বলছে, শুধুমাত্র ট্যাঙ্কের গ্যাসে এত ভয়াবহ বিস্ফোরণের সম্ভবনা কম। পাশাপাশি দুর্ঘটনার স্থানেই নিচে পড়ন্ত তেল, ডিজেল, আবদ্ধ ডিজেল ট্যাঙ্ক এবং ওয়েল্ডিংয়ের আগুনে শিখা একযোগে এই দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

সংস্থাটির প্রাথমিক বিবরণীতে বলা হয়েছে- বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বুধবার সাড়ে ১১ টায়। তারা এই খবর পায় ১১ টা ৩৫ মিনিটে। ঠিক ১৩ মিনিট পর অর্থাৎ ১১ টা ৪৮ মিনিটে পৌছায় সংস্থাটির ১টি এম্বুলেন্সসহ দুইটি অগ্নিনির্বাপক গাড়ি। এদিকে ডিপোটির এত সব স্পর্শকাতর অভিযোগের পরেও নিহত হওয়া শ্রমিকদের উপরই সব দায় ঠেলে দেয় কর্তৃপক্ষ। এসব বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইনকন্ট্রেড কনটেইনার ডিপোর ব্যবস্থাপক (ওয়ার্কশপ) মো. ইয়াসিন বলেন, যে মিস্ত্রি কাজ করসে সে ঢাকনাটা (ডিজেল ট্যাঙ্কের মুখ) খুলে নাই। ওর গাফিলতিটাই এখানে মূল (কারণ)।

ডিপোর অগ্নিনির্বাপক সিলিন্ডার এবং ঘটনাস্থলের কাছেই থাকা অগ্নিনির্বাপক কলটি অকেজো থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ আমরা ওগুলা দিয়েই তো নিভায়ছি। তবে গেইটের কাছে থাকা অন্য একটি অগ্নিনির্বাপক কল থেকে পানি টেনে এনে আগুন নিভানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওইখানে (দুর্ঘটনাস্থানেই) যে ফায়ার সেইফটি কলটা ছিল ওইটা স্টার্ট (চালু) হয়তে একটু সময় লাগছে। অগ্নিদগ্ধ শ্রমিকদের গাড়ি (কার/মাইক্রো)  না দিয়ে তিন চাকার টমটম দেওয়ার ব্যাপারটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাড়ি মানে… তাৎক্ষণিক যেটা ছিলো ওইটা দিয়েছি আরকি। ওই টমটমটিও আমাদের নিজস্ব গাড়ি।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জোবাইর সৈয়দ বলেন, আহত রবিউল ঢাকায় একটি হাসপাতালে রাতে মারা গেছেন বলে শুনেছি। তবে তাদের আত্মীয়-স্বজনের মোবাইল নাম্বার বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করতে পারছি না।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফোকাস চট্টগ্রাম ডটকম

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।