কঠোর লকডাউনের প্রথম দিনে চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকি

নগরীর ২০টি পয়েন্টে চেক পোস্ট

আপডেটের সময়ঃ জুলাই ১, ২০২১

সারা দেশে ‘কঠোর লকডাউনে’আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল তৎপর। চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন প্রবেশ পথে ভোর থেকে অবস্থান নিয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার নগরের সিটি গেইট এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা তল্লাশি শুরু করেন। এছাড়াও লকডাউনে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন প্রবেশ পথে  মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। মাঠে রয়েছে পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও আনসার সদস্যরা।এদিকে, নগরে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশের সঙ্গে রয়েছেন ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। উপজেলা পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক বলেন, সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার সদস্যরাদের নিয়ে নগরের সার্কিট হাউস থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে।

নগরীর প্রবেশ ও বাহিরসহ মোট ২০টি পয়েন্টে চেক পোস্ট বসিয়ে সড়কে চলাচলকারী প্রাইভেট যানবাহন ও রিক্সা ভ্যানে তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। লকডাউন শতভাগ বাস্তবায়নে নগরীর টাইগার পাস, জি.ই.সি মোড়, ষোলশহর ২ নম্বর গেইট, মুরাদপুর, বহদ্দার হাট, কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু চত্ত্বর, আগ্রাবাদ চৌমুহনী, বাদামতল, বারিক বিল্ডিং মোড়সহ বিভিন্ন চেক পোস্টে তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করেন সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ।

এসময় সড়কে চলাচলকারী  কিছু কিছু প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটর সাইকেল ও রিক্সা ভ্যানে তল্লাশী চালিয়ে অতি জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একইসাথে করোনা মোকাবেলায় মাস্ক বিতরণসহ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের নির্দেশনা দেয়া হয়। টাইগার পাস চেক পোস্টে তল্লাশী অভিযান পরিচালনাকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিএমপি’র উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-দক্ষিণ) এন.এম নাসিরুদ্দিন, টি.আই (কোতোয়ালী) প্রশান্ত কুমার দাশ, টি.আই (টাইগার পাস) শেখ ফরহাদুজ্জামান, ট্রাফিক সার্জেন্ট জাকির হোসাইন, ট্রাফিক সার্জেন্ট মোঃ ওয়াসিম আরাফাত, ট্রাফিক সার্জেন্ট আমজাদ হোসেন ও ট্রাফিক সার্জেন্ট ইজাজ আহমেদ।

তল্লাশী অভিযান পরিচালনাকালে সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) শ্যামল কুমার নাথ বলেন, সরকারের মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্দেশনার আলোকে সপ্তাহব্যাপী কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে সিএমপি কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীরের নেতৃত্বে মহানগরীর ৪টি প্রবেশ ও বাহির পথসহ মোট ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের পক্ষ থেকে চেক পোস্ট বসানো হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা যাতে কেউ অমান্য করতে না পারে সে লক্ষ্যে পুলিশের ক্রাইম ও ট্রাফিক বিভাগ চেক পোস্টগুলোতে তল্লাশী অভিযান পরিচালনা করছে। সপ্তাহব্যাপী লকডাউনে অভিযান চলমান থাকবে। প্রাইভেট গাড়ী ও রিক্সা যাত্রী কি কারণে বাসা থেকে বের হচ্ছে তা চেক পোস্টে তদারকি করা হচ্ছে। যারা করোনার দু’টি ভ্যাকসিন দিয়েছেন তারাও যাতে জরুরী প্রয়োজনে মাস্ক ছাড়া বের না হয় সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। জরুরী প্রয়োজনে সড়কে বের হওয়া মোটরসাইকেল চালকদের ‘ওয়ান বাইক ওয়ার মোটর সাইকেল’ নিশ্চিতসহ যাদের মুখে মাস্ক নেই তাদের মাঝে মাস্ক বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, কঠোর লকডাউনে সব ধরণের যান্ত্রিক গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ সময়ে যে সকল গার্মেন্টস, কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে ঐসব প্রতিষ্ঠান নিজ দায়িত্বে গাড়ির ব্যবস্থা করে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আনয়ন করবে। করোনা প্রতিরোধে মাস্ক পরিধান ও শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে আমরা সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করতে চাই।

এদিকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে না আসার অনুরোধ জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ অনুরোধ জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রামে করোনা সংক্রমণের হার ২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ শতাংশ হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে উল্লিখিত জরুরি কাজগুলো ছাড়া অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।  তিনি বলেন, নগরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ১০০ জন ভলান্টিয়ার কাজ করছেন। কাঁচাবাজার ছাড়া সব শপিংমল, বিপণী বিতান বন্ধ থাকবে। কাঁচাবাজারে যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা হয়, সেজন্য প্রতিটি বাজারের সামনে আনসার সদস্য ও ভলান্টিয়ার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।

মমিনুর রহমান বলেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে টহল চলবে। যেহেতু শিল্পকারখানা চালু আছে, কেবলমাত্র শিল্প-কারখানায় চালাচলকারী যানবাহন ছাড়া সব যন্ত্রচালিত যানবাহন বন্ধ থাকবে।

অন্যদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারের ঘোষিত ‘কঠোর লকডাউন’ অমান্য করে বিনা কারণে সড়কে আসা ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, ‘লকডাউন কেমন চলছে’সেটা দেখতে বের হয়েছিলেন তারা। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সকালে নগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড় থেকে তাদের আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ডবলমুরিং থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, লকডাউনে কেউ যাতে বিনা কারণে বাসা থেকে বের না হন, সে ব্যাপারে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। কিন্তু অনেকেই বের হচ্ছেন। জিজ্ঞেস করলে অনেকে সুনির্দিষ্ট কারণ বলছেন। আবার অনেকে বলছেন- লকডাউন কেমন চলছে সেটা দেখতে বের হয়েছেন। এমন ২১ জনকে আমরা আটক করে প্রায় ২ ঘন্টারও বেশি সময় নিজেদের হেফাজতে রেখে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। তারা অঙ্গীকার করেছেন বিনা কারণে তারা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করবেন না।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) আব্দুল ওয়ারীশ জানান, সকাল থেকে ডবলমুরিংসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিনা প্রয়োজনে বের হওয়া পাঁচটি গাড়ি আটক করা হয়েছে। মামলা করা হয়েছে ১০টি গাড়ির ।

এছাড়া যাত্রী পরিবহনের সময় সরকারি অ্যাম্বুলেন্স আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্সটি আটক করা হয়। পরে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুকান্ত সাহা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

জানা গেছে, আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সটি সকালে মেডিক্যাল স্টাফ নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসে। ফিরে যাওয়ার সময় চালক কয়েকজন যাত্রী ওঠায়। পরে মইজ্জারটেক এলাকায় বসানো চেকপোস্টে তল্লাশির মুখে পড়লে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি আটক করে পুলিশ।

কর্ণফুলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুকান্ত সাহা  বলেন, যাত্রী নেওয়ার দায়ে আনোয়ার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সটি পুলিশ আটক করে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাড়ি হওয়ায় রোগীদের কথা ভেবে করে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের সবকিছু ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক।

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।