অনলাইনে হয়রানি বা সাইবার ক্রাইম কিভাবে প্রতিরোধ করবেন?

নিরাপদ থাকার কিছু কৌশল

আপডেটের সময়ঃ জুন ১০, ২০২১

অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার ক্রাইম মারাত্নকভাবে বেড়ে যাচ্ছে । অপরাধ না করেও অনেকে ফেঁসে যাচ্ছেন । ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ সহ সারা দেশে এখন মোট ৮টি সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এই অপরাধ দমনে আদালতগুলো রীতিমত বিচারিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন । থানায়ও এখন সরাসরি মামলা হচ্ছে ।  সোশাল মিডিয়ার এ যুগে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ, তথ্যের আদান প্রদান যেমন সহজতর হয়েছে তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি/ভিডিও অপব্যবহার করে ব্লেকমেইলিংসহ নানান রকম হয়রানির পরিমাণ। কোন কোন ক্ষেত্রে ভিকটিম নিজেও জানছেন না তার তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে অপরাধী/অপরাধীরা ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে ফেইসবুক, টুইটার,  ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিকার চাওয়া তো দূরের কথা অনেক সময় সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে তা প্রকাশ করাও মুশকিল হয়ে পড়ে। অনেকে আত্নহননের পথও বেছে নিতে দেখা গেছে, এ ধরণের সাইবার অপরাধের শিকার হতে পারেন যে কেউ। এমতাবস্থায় আপনার করণীয় কি?

জেনে নিন এমন বিব্রতকর ঘটনা এড়িয়ে নিরাপদ থাকার কিছু কৌশলঃ

(১) অচেনা, অপরিচিত কারো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট Accept  না করা, (২) ফেসবুকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সবার জন্য উম্মুক্ত(Public)  না রাখা,(৩) আপনার ফেসবুক প্রোফাইলের প্রাইভেসি সেটিংস চেক করুন, অন্য কারো পোস্টে আপনাকে Tag করার অপশন উম্মুক্ত রাখবেন না,(৪) আবেগ প্রবণ বা  প্ররোচিত হয়ে উস্কানিমূলক ছবি/ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন,(৫) সন্দেহজনক কোন লিংকে ক্লিক করবেন না,(৬) লগ-ইন আইডি ও পাসওয়ার্ড সংরক্ষণ করুন এবং প্রতিবার ব্যবহার শেষে লগ-আউট করুন,(৭) সন্দেহজনক কোন ইমেইল বা মেসেজ এর উত্তর প্রদান হতে বিরত থাকুন,(৮) আপনার কোন পরিচিতজনের বিপদের কথা জানিয়ে ইমেইল অথবা মেসেজ আসলে আগে যাচাই করুন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন,(৯) পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার কমানো, (১০) ব্যক্তিগত ডিভাইসকে সুরক্ষিত রাখা, (১১) নিজের বা পারিবারিক কোনো ছবি পাবলিক না করা,(১২)  সামাজিক মাধ্যমে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাবধান হওয়া, (১৩) ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও গ্রহণ না করা এবং কেউ গ্রহণ করতে চাইলে তাতে বাধা প্রদান করা, (১৪) মোবাইলে অহেতুক উপহারের কথা শুনে অর্থ লেনদেন না করা, (১৫) বিকাশে ভুয়া মেসেজ না বুঝেই টাকা ট্রাঞ্জেকশন করে ফেলা,(১৬) সুরক্ষিত নয় এমন কোনো জায়গায় ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড না রাখা, (১৭) সুরক্ষিত নয় এমন কোনো দোকানে বা অনলাইন শপে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা না করা ,(১৮)  রিভিউ না দেখেই অনলাইনের বিভিন্ন শপ থেকে কেনাকাটা না করা,(১৯) প্র্যাংকের নামে সমাজবিরোধী কোনো অনলাইন ভিজুয়্যাল কন্টেন্ট না করা এবং শেয়ার থেকে বিরত থাকা,(২০) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন ভালগার গ্রুপ ফলো না করা এবং পোস্ট শেয়ার থেকে বিরত থাকা, (২১) বিপুল পরিমাণ অর্থ লটারীতে জিতেছেন-এমন তথ্যসহকারে পাঠানো ইমেইল বা মেসেজ এর উত্তর প্রদান হতে বিরত থাকা। এসকল তথ্যসম্বলিত মেইল অনুসন্ধানে ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

কি ধরণের হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং কখন আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন?

সামাজিক মাধ্যমে ফেক আইডি খুলে জ্বালাতন, সামাজিক মাধ্যমের আইডি, ইমেইল অথবা ওয়েব সাইট হ্যাক, সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন ট্রল গ্রুপ বা পেজে ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া,বিভিন্ন পর্নো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ধারণ করা ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া,সামাজিক মাধ্যমের আইডি হ্যাক করে অর্থ দাবি,ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান ও হয়রানি,কাউকে মারধর করে তার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া,কোনো কিশোরী বা যুবতী বা নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে তার ভিডিও ধারণ করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া,অনলাইনে ইকমার্সের নামে ভুয়া পেজ খুলে খারাপ পণ্য বিক্রির নামে হয়রানি,অনলাইনে পরিচিত হয়ে অনলাইন কারেন্সি ট্রাঞ্জেকশন করতে গিয়ে ফ্রডের শিকার,ভুয়া বিকাশ নম্বর থেকে ফোন করে লটারির কথা বলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ,ভুয়া বিকাশের এসএমএস দিয়ে গ্রাহককে দিয়েই অভিনব কায়দায় প্রতারণা,অনলাইনে ব্যাংক একাউন্ট আর এটিএম কার্ডের ডিটেইলস চুরি করে অর্থ চুরি,অনলাইনে স্প্যামিং এবং গণ রিপোর্ট,অনলাইনে স্ক্যামিং,অনলাইনে বিভিন্ন সেলেব্রেটি বা মানুষের নামে ভুয়া তথ্য ছড়ানো বা খবর প্রচার, না বুঝে যেটা সেটা শেয়ার করা, অনলাইনে প্রশ্নফাঁস ইত্যাদি ।আসলে এভাবে সাইবার ক্রাইম নিয়ে বলতে গেলে শেষ হবে না। কিন্তু সাইবার ক্রাইম নিয়ে মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে । দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশিরভাগ যুবক এবং আঠারো বছরের শিশুকিশোররা এখনো জানে না যে সাইবার ক্রাইম কি? কি হলে তাকে সাইবার ক্রাইম ধরা যাবে ? অর্থাৎ তাদের মধ্যে সাইবার ক্রাইমের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আইডিয়া নেই। ফলে অনেক শিশু কিশোরদের বিপদে পড়তে দেখা যাচ্ছে, এমন কি অনেকে না জেনে না বুঝে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছে ।

কোথায় অভিযোগ করবেনঃ

(১) প্রাথমিকভাবে অভিযোগ করতে পারেন আপনার নিকটস্থ থানায়। অথবা, (২) ই-মেইলে অভিযোগ জানাতে পারেন cyberhelp@dmp.gov.bd এই ঠিকানায়। অথবা (৩) সরাসরি কথা বলার প্রয়োজনবোধ করলে চলে আসতে পারেন সিএমপি বা ডিএমপি’র কাউন্টার টেরোরিজম ডিভিশনের Cyber Crime Unit অফিসে। কথা বলতে পারেন দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে এই নাম্বারে-০১৭৬৯৬৯১৫২২ । ঠিকানাঃ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ৩৬ শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী স্মরণী, রমনা, ঢাকা অথবা চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর, দামপাড়া এবং নিজ নিজ এলাকার মেট্রো জেলা পুলিশ হেড কোয়াটার এর সাইবার ইউনিট । পুলিশ থানায় মামলা না নিলে বর্তমানে দেশের সাইবার কোর্টসমূহে আইনজীবিদের মাধ্যমে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করা যায় । ভিকটিমকে নিজেই বাদী হতে হয়, পাওয়ার অব এটর্নি দিয়ে মামলা হয় না ।

কিভাবে অভিযোগ করবেনঃ

ভিক্টিমাইজড হলে যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ জানানো উচিত। অভিযোগ করার ক্ষেত্রে আপনার অভিযোগের স্বপক্ষে কিছু প্রমাণাদি প্রয়োজন। যেমন এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলামতের স্ক্রীনশট, লিংক, অডিও/ভিডিও ফাইল অথবা রিলেটেড ডকুমেন্টস। স্ক্রীনশট সংগ্রহের ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন Address Bar এর URL টি দৃশ্যমান হয়। ই-মেইল এর মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে চাইলে এসব কন্টেন্ট এটাচ করে আপলোড করতে হবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে সরাসরি সফট কপি দেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি আপনি প্রয়োজনে Cyber Crime Unit এর অফিসারদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন যা আপনার আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সহায়ক হতে পারে।

তবে অ্যাপস বন্ধ করা যেমন কঠিন তেমনি সেগুলো নিষিদ্ধ করেও লাভ নাই৷ নিষিদ্ধ করে ব্যবহার ঠেকানো যায় না৷ এর জন্য দুইটি বিষয়ে জোর দেয়া প্রয়োজন৷ সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের সক্ষমতা আরো বাড়ানো এবং দরকার প্যারেন্টাল গাইডেন্স অর্থাৎ সন্তান যে গ্যাজেটটি ব্যবহার করছে তার প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অন করে দিতে হবে৷ ফলে সন্তান যদি কোনো নিষিদ্ধ অ্যাপ ব্যবহার করে, সাইটে ঢুকে বা গ্রুপে তৎপর হয় তাৎক্ষণিকভাবে তার নোটিফিকেশন পাবেন৷ উপরোক্ত সকল বিষয়গুলো আমরা মেনে চলি তাহলে সাইবার ক্রাইম অনেকাংশে কমে যাবে । প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের বিবেক বুদ্ধি ও বিবেচনাকে নৈতিকতার মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে না । সবাইকে বুঝতে হবে দেশের সাইবার ইউনিটসমূহ সাইবার ক্রাইম মনিটরিং হচ্ছে, যেকন সময় যেকোন বিপদে পড়তে পারেন । তাই সকল নাগরিককে সচেতন ও সাবধান হতে হবে ।

লেখক: জিয়া হাবীব আহসান, এডভোকেট। Email- bhrfctg@gmail.com

পরিবার ও দেশকে সুস্থ রাখতে ঘরে থাকুন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরিধানসহ নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। সৌজন্যেঃ দেশচিত্র ডটনেট।